অনেকেই বইটির সম্পর্কে নিজের মতামত এভাবেই ব্যক্ত করেন,-“খ্রিস্টান ধর্মের ভিত নাড়িয়ে দেওয়া এক অনন্য থ্রিলার”
কিংবা এই বই খ্রিস্ট ধর্মের কুসংস্কারের উপর এক বড় চটোপেঘাত!

বইটি হয়তো ইতোমধ্যেইই সবাই পড়ে ফেলছেন।এবং অনেকেদেরই প্রিয় রহস্যপোন্যাসের তালিকার উপরের দিকেই থাকবে।
সাধারণত কোন বই থেকে এডাপ্ট করা মুভি আমি একবার দেখে ফেললে সেই বইটি আর তেমন পড়ার আগ্রহ পাই না।
টম-হ্যাংকস এর ফ্যান হওয়ার সুবাদে দ্য ভিঞ্চি কোড মুভিটি দেখা ছিল অনেক আগেই।

দুদিন আগে এক ফ্রেন্ড এর সাথে ইনবক্সে বইটির সেনসিটিভ বিষয় নিয়ে আলাপচারিতার এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেই, ৪৪০ পৃষ্ঠার একটা জার্নিতে নিজেকে জড়ানোর!
ফলাফল গতরাত থেকে আজ পর্যন্ত পুরো বই শেষ করলাম সেই সাথে ২ ঘন্টা ৫০ মিনিটের মুভিটি ২য় বারের মত দেখলাম।

আমি শেখ আব্দুল হাকিমের অনুবাদটি পড়েছি।আমার ভালোই লেগেছে এর অনুবাদটা।
রহস্যোপন্যাস লেখক হিসেবে ড্যান ব্রাউন একেবারে লা-জওয়াব।লেখার বিষয়বস্তু যাইই হোক না কেন,তার বর্ণনাভঙ্গী বিশেষত ঐতিহাসিক স্থান গুলি ডেস্ক্রাইভ করাটা ছিল অত্যন্ত চমৎকার।

দ্য ভিঞ্চি কোডের টপিক খুবই সেনসেটিভ।খ্রিস্ট ধর্মের ভিত্তি নিয়ে লেখক বেশ রকমের নাড়াছাড়া করার চেস্টা করেছেন।কতটুকু সফল হইছেন সেইটা অবশ্য আলোচনার দাবি রাখে।
ধর্মীয় সেনসিটিভ বিষয় নিয়ে নাড়াছাড়া করার কারনেই কিনা ২০০৩ সালে মুক্তি পাওয়া এই থ্রিলার ঘরানার বইটির ৪৫ টি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। সেই সাথে ব্যানড ও হয়েছে অনেকগুলো দেশে!

বইয়ের কাহিনী শুরু হয় ফ্রান্সের লুভ্যর মিউজিয়ামের কিউরেটর জ্যাক সঁনিয়েরের গুলি খাওয়ার মধ্য দিয়ে। যিনি কিনা ২০ শতাব্দী প্রাচীন একটা সিক্রেট সোসাইটি, প্রায়োরি অব সায়ন এর সদস্য। যারা কিনা আবার দুই হাজার বছরের পুরনো একটা সত্যকে প্রটেক্ট করে আসছে।এই প্রাচীন সিক্রেট সোসাইটির সদস্যদের মধ্যে আইজ্যাক নিউটন, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি,ভিক্টর হুগোর মত জাঁদরেল নাম ও আছে।
এই গুপ্ত সংঘের পেছনে লেগেছে আরেক কট্টরপন্থী খ্রিস্টান গুপ্ত সংঘ,যার নাম অপাস-দেই।

প্রফেসর রবার্ট ল্যাংডন যিনি একজন ক্রিপ্টোলজি বিশেষজ্ঞ,ইতোমধ্যেই দুনিয়াজুড়ে নাম কামিয়ে ফেলেছেন, তিনি ঘটনা চক্রে ফেঁসে যান এই দুই গুপ্ত-সংঘের মাঝখানে।সেই সাথে পরিচয় হয় আরেক ক্রিপ্টো বিশেষজ্ঞ কিউরেটর জ্যাক সনিয়েরের নাতনি সোফির সাথে।দুজনে মিলে নেমে পড়েন কিউরেটরের মৃত্যু পুর্বমুর্হুতে লিখে যাওয়া অদ্ভুত চিত্রকর্মের রহস্য উদঘাটনে।যে রহস্য আপনাকে নিয়ে যাবে ফ্রান্সের লুভ্যর মিউজিয়াম থেকে ৩০০ শতকের রোম হয়ে আধুনিক ইংল্যান্ডের ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবিতে।

এই ছিল বইয়ের সংক্ষিপ্ত সামারি,বইটি ফিকশনাল ধাঁচে লেখা হলে বইয়ের ২য় পৃষ্ঠায় ড্যান ব্রাউন পই পই করে বলে দিয়েছেন এই বইয়ে লেখা সকল ঐতিহাসিক বয়ান সহ সবই সত্য।

তাই আমি লেখার বিষয়বস্তু নিয়ে হালকা নাড়াচাড়া করেছিলাম,যা জানলাম তা নিয়ে কিছু খেজুরে আলাপ শুরু না করলে আমার আবার হচ্ছে না! তাইল এখন আমি এখন ইতিহাস নিয়ে কিছুক্ষন কচলাকচলি করবো

-স্পয়লার এলার্ট দিবেন না?
— এখন যা বলবো তা পড়ার পর বইটি পড়ার আগ্রহ অনেক বেড়ে যাবে। নয়তো একেবারে নাইই হয়ে যাবে।কাজেই স্পয়লার দিলেও দেওয়া যায়,আবার না দিলেও চলে।

বই আর মুভিতেই একটা নাম সর্বত্রই দেখা যায়।
মেরি ম্যাগডালিন।
আর মেরি ম্যাগডালিনের রেফারেন্স হিসেবে দেখানো লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির দ্য লাস্ট সাপার চিত্রকর্ম কে।ওখানে দেখানো হয় লাস্ট সাপারে যিশুর এর পাশে একজন মহিলা ও আছে। যাকে পরিচয় দেওয়া হয় যিশুর স্ত্রী হিসেবে।

যাই হোক বাইবেলে কিন্তু এই লাস্ট সাপার বিষয়টি বেশ বিতর্কিত।
তার আগেই বলে নেই বাইবেলের চারটা ভার্সন আছে মোট। লুক,মথি,লেভিয়, আর জোনাহ।এরা হইলো যিশু বা জেসাস এর সহচর বা সাহাবি।

এর মধ্যে লুক আর মথির বয়ানে লাস্ট সাপারের কথা উল্লেখ আছে।কিন্তু তারা আবার সেখানে উপস্থিত ছিলোই না।(মানে লাস্ট সাপারের সময়)

বলা হয়ে থাকে রোমান রা যিশুকে ধরে নিয়ে যাওয়ার আগের দিন এই লাস্ট সাপার হয়েছিলো।(লুক আর জোনাহ মতে)
বাকী দুইজন অর্থাৎ লেভিয় আর জোনাহ এর মতে লাস্ট সাপার নামের কোন কাহিনিই হয়নি।

বুঝাই যাচ্ছে বাইবেলের বর্ণনা একটার সাথে আরেকটা সাংঘর্ষিক।

তাই লাস্ট সাপারের বুজরুকিতে অনেক ক্রিস্টানই বিশ্বাস রাখে না। দুনিয়ার দুই বৃহত্তম খ্রিস্টান গোষ্ঠীর একদল ক্যাথলিক ক্রিস্টানরা লুক আর মথির বাইবেল ফলো করে। তাই তারা বিশ্বাস করে।
আর অন্যদল মানে অর্থোডক্সরা (মেইনলি গ্রীকো-রুশ অর্থোডক্স) লেভিয় আর জোনাহ এর বাইবেল এর ফলোয়ার।তাই তারা লাস্ট সাপারে বিশ্বাস করে না।

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি ক্যাথলিক পরিবারে জন্ম গ্রহন করেছিলেন।সম্ভবত তিনি ও ক্যাথলিকও ছিলেন। তাই তিনি লাস্ট সাপারের চিত্রটি এঁকেছিলেন।(অনেকেই বলে তিনি পরে ইউরোপিয় নিউপ্যাগানিজমের অনুসারী হয়েছিলেন।)

যিশুর মৃত্যুর তার অনুসারীরা চারদিকে যখন ক্রিস্টান ধর্মের একেশ্বরবাদীতার প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছিলো, তখন দুনিয়ার বৃহত্তম সাম্রাজ্য রোম ছিল আকন্ঠ প্যাগানিজমে মত্ত।প্যাগানিজমের মুল ভিত্তি হইলো মুর্তিপুজা আর অবাধ যৌনাচার!বিয়ে-টিয়ের বালাই নাই। যৌনতার মাধ্যমে মানব মুক্তির পথ খোঁজা হইত।(প্যাগানিজম নিয়ে আমার আলাদা একটা পোস্ট আছে।লাগলে ইনবক্স করতে পারেন।)

সেইসময়ে প্যাগানিজমদের বিরুদ্ধে ক্রিস্টান সেইন্টদের একেশ্বরবাদের এই প্রচার প্রচারণা বিফলে যায় নি।
৩০০ বছর পর রোমের কাইজার পদে আসীন সম্রাট কনস্টান্টাইন খ্রিস্টান ধর্মকে রোমের একমাত্র রাষ্ট্রধর্মে উপনীত করেন।প্যাগানিজম কে বাদ দিয়ে। তারপর থেকে খ্রিস্টান ধর্মই হয়ে যায় ইউরোপের বিশাল সংখ্যক মানুষের ধর্ম।

এই প্যাগানিজম নতুন করে পুনজর্ন্ম লাভ করে ১৫-১৬ সেঞ্চুরীতে।
নিউপ্যাগানিজম নামে
এই নিউ প্যাগানিজমে ঈশ্বর নাই। এন্টি ঈশ্বর আছে। এই এন্টি ঈশ্বর হইলো শয়তান,যার ইংরেজি অর্থ Satan, স্প্যানিশে বলে অ্যাস্মোডিউস।যার অর্থ আগুনের অহংকার!
তাই এই নিউপ্যাগানিজম তাই স্যাটানিজম নামে ও পরিচিত। যারা এই নিউপ্যাগানিজমের অনুসারীবা শয়তানের উপাসনা করে তাদের স্যাটানিক বলে। আপনারা অনেকে এই নামের সাথে পরিচিত থাকবেন অবশ্য!

স্যাটানিজম আসলে কি? এই স্যাটানিজমে কোন গড নাই।অনলি শয়তানের উপসনা করে।ঈশ্বর নামে যে আল্লাহ,গড,ভগবান আছে তার ঈশ্বর হবার কোন যোগ্যতা নাই।সে অহংকার কইরা শয়তানকে পূণ্য থেকে বঞ্চিত করেছে।(আদম সৃষ্টির কাহিনী দ্রষ্টব্য)।তাই শয়তানের অনুসারীদের কর্তব্য হইলো সব পাপ করে ঈশ্বর উপর প্রতিশোধ নেওয়া।দেখায় দেওয়া যে মহান শয়তানের সাধকরা ইহজগতে কতটা পাওয়ারফুল।
এদের আরেকটা গুরুত্বপুর্ণ নীতি হলো spread the blood।ঈশ্বর আইনে বহুগামিতা বা গণ-যৌনাচারের কোন স্থান নাই।এক সেক্সেরই জন্যেই অনেক আইন আছে। লিমিটেশন আছে।
যেমন বিয়া ছাড়া সেক্স হারাম।মা-বাবা,ভাই-বোন বা রক্তসম্পর্কীয়দের সাথে কোন যৌনাচার চলবে না।
এই স্যাটানিস্টরা এর বীপরিত।তাই এইটারে এন্টি-রিলিজিয়ন কোন প্রথা বলা যায়।যেখানে সকল ধরনের পাপের বৈধতা আছে।যেহেতু ঈশ্বর হইলো ভালোর দলে আর শয়তান হইলো খারাপের দলে তাই এই স্যাটানিজমে শয়তানের উপাসনা করার পাশাপাশি অবাধ যৌনাচার-ইনসেস্টকে উৎসাহ দেওয়া হয়।

হলিউডে স্ট্যানলি কুব্রিক এর একটা কাল্ট ক্লাসিক মুভি আছে। নাম আই ওয়াইড শাউট।টম ক্রুজ আর নিকোল কিডম্যানের মুভি। অনেকে হয়তো দেখেছেনও। ওই সিনেমায় প্যাগানিজমদের উপাসনা ও অবাধ যৌনাচারের ধরণ দেখানো হয়েছে।

রথসচাইল্ড ফ্যামিলি,কেটি পেরি,রাণী এলিজাবেথ,এমিনেম,কোলিন্দা গ্রাবার কিতারোভিচ,জর্জবুশ এর মত বিখ্যাত সব নাম আছে যারা স্যাটানিজমের অনুসারী 😛 😛

যাকগে! তো এই নিউপ্যাগানিজমরা আবার বনী ইসরাইলের ইব্রাহিম বা আব্রাহামিক রিউচুয়ালকে অত্যন্ত ঘৃণা করে। এর কারন ও আছে। বনী ইসরাইলের জন্যে প্রেরিত নবী আব্রাহামই প্রথম শয়তান মুর্তি ধ্বংস করেছিলেন।এসিরিয়ান প্যাগানিজমের অনুসারী উর শহরের শাসক নমরুদ কে পরাজিত করার পর আব্রাহাম শয়তান মন্দির ধ্বংস করেন। আর ঈশা (আঃ) এই আব্রাহামেরই ব্লাডলাইন।

পুনর্জন্ম নেওয়া নিউপ্যাগানিজমের অনুসারীরা শয়তানের পাশাপাশি তার সহচর হিসেবে যিশুর ও উপাসনা করতো যিশুর অবমাননার উদ্দেশ্যে।প্যাগানিজমে উপাসনার একটা নিয়ম আছে,তা হইলো উপসনা করতে হইলে সাধন সঙ্গী/সঙ্গিনী লাগবেই। তাই সিস্টেম মতে যিশুর ও একজন সাধন সঙ্গিনীর দরকার হয়।

তাই এমন কাউকে সাধন সঙ্গিনী বানাইতে হবে যার সাথে সেক্স করা পৃথিবীর যে কোন ধর্ম যদি সেইটা প্যাগানিজম দ্বারা বিকৃত হয়েও থাকে, তাতেও পাপ।
যে কোনভাবেই হোক শয়তানেরে তো খুশি করা লাগবেইই।
দ্য ভিঞ্চি কোডে আপনারা একটা নাম সর্বত্রই দেখতে পাবেন।মেরি ম্যাগডালিন!
এখন মেরি কে বলুন তো? 😉
মেরি হইলো যিশুর আম্মা।
আর ম্যাগডিলান হইলো গ্রীক শব্দ। যার অর্থ ক্রসে শুয়ে সহবাস করা।
তাইলে মেরি ম্যাগডিলান এর মানে কি হইলো?
মেরি ক্রসের উপর শুয়ে সহবাস করে।
আর মেরি যেহেতু যিশুর মা,আর দ্য ভিঞ্চি কোড মতে মেরি যিশুর স্ত্রী তাইলে সমীকরণটা কি দাঁড়ায়??
যিশু তার মায়ের সাথে ক্রসে শুয়ে সহবাস করে!

যাকগা,বই বাদ। দ্য ভিঞ্চি কোড মুভিতে দেখবেন সোফি যখন বোর্ডিং স্কুল থেকে না বলে হঠাৎ বাড়িতে চলে আসে,তখন দেখে বাড়িতে গোপনে কি যেন হচ্ছে।জানালা দিয়ে সে তাকিয়ে দেখে, মুখোশ ও চোঙ্গাকৃতির টুপি পরিহিত কিছু মানুষ একটি টেবিলের চারপাশে দাঁড়িয়ে মন্ত্র পাঠ করতেছে আর টেবিলে বুইড়া জ্যাক সঁনিয়ের এক কচি যুবতী মেয়ের সাথে ভিতরে বাহিরে অন্তরে-অন্তরে টাইপের কোন প্রাচীন আমলের খেলাধুলা করতেছে!

এটা দেখে সোফি আবার চলে যায়!

এখন বইতে+মুভিতেই আমরা দেখি জ্যাক সঁনিয়ের শতাব্দী প্রাচীন সংঘটন প্রায়োরি অব সাইয়োনের মেম্বার!আর তারা তাদের গোপন সভায়(নাকি উপাসনায়?) এরকম আদিম খেলাখুলার চর্চা করে,তাহলে আমরা কি ধরে নিতে পারি? প্রায়োরি অব সাইয়োন নিউপ্যাগানিজম চর্চা করে। 😛 আর খ্রিস্টের ব্লাডলাইন রক্ষা করে একদল শয়তানের অনুসারী!?

(অহ্নো :V ) ( একেবারে খ্রিস্টান ধর্মের মা কা বাপ করে দিসে পুরা বই আর মুভিতে 😞 )

যাকগা আর কথা বাড়াইলাম না। অনেক লম্বা হয়ে গেছে।আপনাদের নিজস্ব কোন মতামত থাকলে কমেন্ট বক্স খোলাই আছে!

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here