এক,
সাধারণত অবসর সময়ে,যখন আমি নস্টালজিক হয়ে যাই,তখন আমি পরোটা খেতে খেতে আমার দুই বন্ধু আর রায়হান আখন্দ এবং ইমতিয়াজ আল হাবীবের কথা ভাবি।

তাদের কথা ভাবতে গেলে মনে পড়ে যায় তাদের দুই স্ত্রীর কথা।যাদের সম্পর্কে নানা রকম প্রাণঘাতী কথা-উপকথা শুনে আমি বিয়ে না করে চিরকুমারব্রত পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

মাঝে মধ্যে যখন মনে বিয়ে করার খায়েস জেগে উঠে যখন আমি পড়োটা বেলতে বেলতে কিংবা খেতে খেতে আর রায়হান আকন্দ আর ইমতিয়াজ আল হাবিবের জীবনের প্রানঘাতী অধ্যায়ের স্মৃতিচারণা করি। এবং বিয়ের খায়েস কর্পুরের মত উড়িয়ে দিয়েই তবে নিবৃত হই!

অবশ্য পুরো কাহীনি শুনলে আপনাদের মনে ও নারী জাতি কিংবা বিবাহ পরবর্তী জীবন সম্পর্কে অযাচিত কু-ধারণা জন্মানো অস্বাভাবিক নাহ!

দুই,
গল্পটা ছিল,যখন আমার মধ্যযৌবন,ঠিক তখনকার।এখনকার বয়স হিসেব করতে বলতে গেলে,সে বহুকাল আগের কথা! সে যাই হোক,তাদের নাম ছিল যথাক্রমে আর রায়হান আকন্দ আর ইমতিয়াজ আল হাবীব।

আর রায়হান আকন্দ ছিল দুঁদে সাংবাদিক,দেশের প্রথম পাঁচজন টেলিপ্রিন্টার ব্যবহার করা সাংবাদিকদের একজন,তাবড় তাবড় লোকজন তার ভয়ে থরহরি কম্প হয়ে থাকত! আর রায়হান আকন্দ পত্রিকায় কারো নামে প্রতিবেদন ঠুকে দিলে তার আর রেহাই ছিল না।অনেকটা পরসুইন তো মরসুইন টাইপের! ভীষন কড়া ছিল তার লেখনী,ধারে আর ভারে একেবারে হাড়ে হাড়ে কাটতো।এমন কোন বদলোক ছিলনা যে আর রায়হান আকন্দকে সমজে না চলতো।বিদেশী এক বেয়াদব কোম্পানীকে তো আর রায়হান আকন্দ বলতে গেলে একাই লড়ে দেশছাড়া করছিলো।এমনই ভয় পেয়েছিলো যে,দুই নাম্বারের দল,যে পাশের ভারত কিংবা বার্মাতে ও ব্যবসা খুলতে সাহস করেনি।এমনই তেজ আর তান্ডব ছিল তার লেখনীতে!

ওদিকে ইমতিয়াজ আল হাবীব ছিল দুঁদে উকিল।অল্প বয়সেই প্রচন্ড পসার ছিল তার।মফস্বলের সেই শহরে কোন রকম বেসামাল মোকদ্দমায় ফাঁসার আরেক অর্থ ছিল ইমতিয়াজ আল হাবীব এর শরণাপান্ন হওয়া।বাঘা বাঘা বিচারকরা ও হাবিবের সামনে কেঁচো হয়ে কুঁকড়ে-মুঁকড়ে থাকতো।বদলোকের বদকাজের ভরসাই ছিল ইমতিয়াজ আল হাবীব।দিনে দুপুরে শ’খানেক লোকের সামনে খুন করার পরে ও কেবল ইমতিয়াজ আল হাবীবকে উকিল করার কারণে বেকসুর খালাস পেয়ে গেছে ,এমন লোক খুজলে ও জীবিত পাওয়া যাবে প্রচুর!
ওদিকে নিরীহ স্কুলমাস্টারকে ব্যাংক ডাকাতির অভিযোগে বারোবছর জেলের ঘানি টানানোটাও ছিল ইমতিয়াজ আল হাবীব এর জন্যে ছেলেখেলা।স্থানীয় স্কুল মাস্টারেরা তাই সর্বদা তটস্থ হয়ে থাকতো!

দুজনে ছিল ছেলেবেলার বন্ধু।একই স্কুলে একই মেয়ের সাথে টাংকি মেরে,প্রেম করে ছ্যাঁকা খাওয়া দুই হরিহর আত্না ছিল তারা!একই শুঁড়িখানায় একই বোতলের মদ দুই গ্লাসে ঢেলে বহুবার খেয়েছে।দুজনেই ছিল দেখতে পুরাই ভিলেনের মত। আর রায়হান আকন্দের কপালে ছিল এক ইয়া বড় আঁচিল।আর ইমতিয়াজ আল হাবীবের ছিল এক জোড়া রোমশ ভুরু! (এহেন বদলোকের সাথে আমার বন্ধুত্ব কেমন করে হল,সে গল্প আরেকদিন হবে!)

দুজনের সমস্যাই ছিল এক।সুন্দরী মেয়ে বা মহিলা দুইটার একটাই দেখলেই হল,নানা কু-মলতব মাথা ছাড়া দিয়ে উঠতো! আর রায়হান আখন্দ মাঝে মাঝে উঠতি নায়িকাদের নামে-বেনামে ফোন দিয়ে তাদের মনে অতিশয় বিরক্তি উদ্রেক করতো,মিটিং-ফাংশনে পরিচয় লুকিয়ে চিঠি-চিরকুট পাঠাতো।আর ইমতিয়াজ আল হাবীব চেষ্টা করতো নিত্যনতুন স্যুটকেস গায়ে দিয়ে সুন্দরী মেয়েদের গায়ে গা লাগিয়ে পারলে ঢলাঢলি করে ছবি তুলতো!সে সময়ের বড় বড় দুই দিস্তার একখানা এলবাম ছিল তার কাছে এ-সব গাঁ ঘেষা ছবিওয়ালা!

কিন্তু দিন যত যায়,আর রায়হান আকন্দ আর ইমতিয়াজ আল হাবীবের বাড়ী থেকে চাপ আসতে থাকে বিয়ে থা করে সংসারী হবার জন্যে।আর রায়হান আকন্দের বাবা মরার আগে নাতীর মুখ দেখার জন্যে একরকম মারাত্বক রমকের গোঁ ধরে বসেন।ওদিকে ইমতিয়াজ আল হাবীবের মা ও মৃত্যুর আগে নাতী দর্শনের এক মর্মান্তিক আবদার ফেঁদে বসেন।পরিবারের চাপে আকন্দ আর হাবীব দুজনেই নতি স্বীকার করতে বাধ্য হন।যদিও হাবীব আকন্দকে পরামর্শ দিয়েছিলেন,’সন্তানকে বাৎসল্য দিয়ে ব্ল্যাকমেইল প্রবণতা আশংকাজনকহারে বাড়ছে,নিবারণে চাই কঠোর আইন’ শিরোনামে একটি আর্টিকেল লিখে দেশের নামজাদা কোন এক পত্রিকার হেডলাইনে ঠুকে দিতে!আকন্দ রাজী হননি।যদিও তিনি হাবীবোদ্ধারের মহতী উদ্দেশ্যে,’মৃত্যুর আগে নাতনী দর্শন-মায়েদের স্বার্থউদ্ধারের ভয়ানক কূটকৌশল’ শিরোনামে একটি আর্টিকেল প্রায় গুছিয়ে এনেছিলেন।

আকন্দ তার আঁচিল পাকিয়ে তাকিয়ে বললেন,’ভাই হেবো,এই স্পুর্তিময় জীবনে মনে হয় একটা দাঁড়ি যোগ করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।চলো আর গ্যাঞ্জাম না করে একটা সরলস্বভাবা নারীকে বিবাহ করে সংসারধর্ম পালন করি।রবি ঠাকুরের ইসটাইলে প্রচুর সন্তানাদি উৎপাদন করে মহিলাকে সংসারধর্মের ঘানিগাছ ঠেলতে দিয়ে তারপর না হয় এই স্পুর্তিময় জীবনে পুনঃপ্রবেশ করিবো।তখন এক্কেরে দুনিয়ে কাঁপিয়ে দিবো যে,শুঁড়িখানার মালকিন গুলো আর বিশ্রাম পাবে না!

অন্যদিকে হাবীব ও তার জোড়া ভুরু কুঁচকে বললেন,’দোস্ত আক্কু,এই রঙ্গিন নেশারু রাত্রীগুলোর উপরে রুলজারী করতে হবে।চলো ভোলাভালা এক রমণীকে মুসলিম আইন অনুযায়ী শাদী করে কাবিননামা দেখিয়ে বাপ-মাকে শান্ত করাই।এক বা একাধিক সন্তানের ট্যাঁও ট্যাঁও কান্না শুনিয়ে তাদের সংক্ষুদ্ধচিত্তে একটু ঠান্ডা পানি ঢালি।জন্মনিয়ন্ত্রন পদ্ধতিগুলোকে রদকরে রাখলে অচিরেই প্রচুর সন্তানাদি উতপাদন করে স্ত্রীকে সাংসারিক কৃত্যাদিতে ব্যস্ত করার পর না হয় আবার শুঁড়িখানায় প্রমোদালয় গরম করে ফেলব!

তারপর দুই বাল্য বন্ধু এক হপ্তার ব্যবধানে বিয়ের পিড়িতে বসে পড়লেন।প্রথমে কবুলমন্ত্র আবৃত্তি করে উত্তেজনায় ভরপুর ব্যাচেলর জীবনের খাতা থেকে নাম কাটিয়ে নিলেন আর রায়হান আখন্দ।বরযাত্রী হিসেবে গিয়েছিলেন ইমতিয়াজ আল হাবীব।বিয়ের মঞ্চে বসে তিনি আকন্দকে বললেন,’আক্কু,তুমি তো ভাগ্যবান হে!সারাজীবন বদমায়েসী করে এসে এমন পরীর মত সুন্দরী বউ পেলে!’

আকন্দ কিছুই বললেন না।বউ খব বেশী পছন্দ হয়নি তার!

পরের হপ্তায় ইমতিয়াজ আল হাবীব মুখে রুমাল গুঁজে বরযাত্রার অগ্রভাগে চললেন।বিয়ের মঞ্চে বসে আকন্দ তার কানে কানে বললেন,’দোস্ত,তুমি তো কামাল কর দিয়া!সারাজীবন ধ্যাষ্টামো করে এসে এমন নায়িকার মত ঝলমলে বউ পেলে!’

হাবীব জোরা ভুরু কুঁচকে তাকালেন কেবল,কিছু বললেন না।বউ খুব বেশী পছন্দ হয়নি তার।

তিন,
সরলস্বভাবা নারী বিবাহের এরাদা থাকলে ও আকন্দ আর হাবীব উভয়ের ললাটলিখনে অতিশয় কূটবুদ্ধিসম্পনা দুই রমণীর বায়োডাটা ২০ সাইজের ফন্টে বোল্ড ফরম্যাটে লিখিত ছিল। আকন্দের স্ত্রী,(যার নাম আমি ভুলে গেছি বিধায় আক্কুনি বলে ডাকি!) ছিলেন চলিত অর্থে রূপসী ও খরবুদ্ধিসম্পন্না।হাবীবের স্ত্রী,(এর নাম ও বয়সের সাথে গুলে খেয়ে ফেলেছি বিধায় যাকে হেবোনী বলে ডাকি ) ও ছিলেন অনুরূপ রূপপ্সী ও ও বুদ্ধিমতী।আকন্দ অনুভব করলেন,তার স্ত্রী আক্কুনির জিব তার কলমের চাইতে কোনও অংশে কম তীক্ষ্ণ নয়,সেটিও ধারে ভারে প্রতিপক্ষকে একেবারে ফর্দাফাই করে ছাড়ে।ওদিকে হাবীব দেখলেন জীবনের এই মামলায় তিনি সানডে মানডে ক্লোজ হারা হারছেন।তার বউ হেবোনীর উকিলী বুদ্ধি তারছেয়ে বহুগুনে শাণিত,পদে পদে না আবছা কালাকানুনের প্যাঁচ মেরে তিনি হাবিবকে পর্যুদস্ত করে ছাড়ছেন।

আকন্দ আর হাবীব পরষ্পরের জানী দোস্ত হলে ও তাদ্রে স্ত্রীদের মধ্যে কোনও রকম সখ্যতা গড়ে উঠলো না।আক্কুনী প্রায়শই আকন্দকে হাবীবের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্টা করতে লাগলেন,এবং হেবোনির নানা রকম ত্রুটি ফলাও করে ব্যাখা করতে লাগলেন।এসব আলোচনা শয্যায় হতো বলে বেশীরভাগ সময় আকন্দকে আক্কুনীর বক্তব্যে সম্মতিজ্ঞাপন করে উত্তমাঝাবাদ জানাতে হতো।অন্যথা হলেই আক্কুনী প্যারাসিটামল-ঘাতী এক অচিন্তনীয় অসহনীয় মাথাব্যাথায় আক্রান্ত হতেন।ওদিকে হেবোনীর আচরণও কিছুটা আক্কুনীর কার্যক্রমের কার্বনকপি বিবেচনায় যোগ্য ছিল,তিনিও বছরের যেসব ঋতুতে শয্যায় ঘণীভূত হয়ে শয়নের তাগিদ জোরদার হয়,সেসব ঋতুতে হাবিবকে তার দোস্ত আকন্দের নানা দোষ সম্পর্কে আলোকিত করতেন,আর আক্কুনির সাথে যে কলতলায় সমবেত গাগরীবারবনিতা মুখরা মেয়েলোকদের কোন পার্থক্য নেই সে ব্যাপারে বিশদ যুক্তিবিস্তারে সচেষ্ট থাকতেন।কোনভাবে ঐক্যমতে না পৌঁছালে তিনি হাবিবকে শয্যাত্যাগ করে মেঝেতে শুইতে বাধ্য করতেন।

ফলে বছরখানেক অতিক্রান্ত হবার পর দুই বন্ধুর দোস্তি শীতল ও শিথিল হয়ে এল।তারা আর আর বিবাহিত জীবনের শুরুতে যেন মাঝে মাঝে বৌদের খরচক্ষু ফাঁকি দিয়ে বারে গিয়ে কয়েক বোতল মেয়ে আসতেন,তেমন প্রীতিসাক্ষাতে মিলিত হতে পারতেন না।কদাচিত আকন্দ অফিসের পর একটি আঁধপাইটের বোতল চটের ব্যাগবন্দী করে সন্তর্পনে হাবিবের চেম্বারে ঢুকতেন,কিংবা হাবীব লাঞ্চব্রেকে আকন্দের অফিসে একটি শিশুতোষ আকৃতির মদের বোতল নিয়ে বন্ধু সাক্ষাতে মিলিত হতেন।

আক্কুনি আর হেবোনির কোনও দাওয়াত-ফাংশন-সম্মেলনে মুখমুখি হলে পরষ্পরকে অতিশয় শীতল ভঙ্গিতে গ্রহন করতেন।দু’জনেই সম্ভ্যাব্য রকম প্রকাশ্য অলংকারে ভূষিত হয়ে একে অপরকে হিংসায় জর্জরিত করার চেষ্টা করতেন,একে অপরকে নানা রকম তির্যক মন্তব্যে খাটো করার চেস্টা করতেন।তবে বড় কোনরকমের পারমানবিক হলোকাস্ট তারা ঘটাননি বা ঘটাতে পারেননি।

দিন এভাবেই যাচ্ছিলো।
তারপর একদিন ঘটলো এক কিমাশ্চর্যম।
হাবিব আকন্দের অফিসে একটি প্রমাণসাইজের আকন্দচিত কলেবরের বোতল নিয়ে হাজির।
‘দোস্ত আক্কুউউ……চলো সেলিব্রেট করি!’
আকন্দ হেসে চশমা খুলে বলল,’কীভাবে মরলো??’
হাবিব থতমত খেয়ে বলল,’কে মরবে?;
আকন্দ সামলে নিয়ে বললেন,’না…মানে,ওই আর কি…তা সুখবরটা কি?
হাবিব বললেন,বাচ্চা হবে দোস্ত!অবশেষে উপরওয়ালা একটা কাজের কাজ সম্পন্ন করেছেন!বউ সামনের কয়েকটা বছর বাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত থাকবে।একটু শান্তিরমুখ দেখতে পাবো।

আকন্দের মনে আনুষঙ্গিক আপদের ভাবনা এলেও এই শুভলগ্নে তিনি আর খোঁচ ধরলেন না।বরং বড় দুইখানা গেলাস বের করলেন আলমারি থেকে।

ঠিক পরের হপ্তায় আকন্দ হাবিবের চেম্বারে একটা হাবীবিয় আকারের দারুর বোতল নিয়ে তাশরিফ রাখলেন।
হাবিব ফাইল থেকে চোখ তুলে বললেন’কত ধারায় ফাঁসাতে হবে?’
আকন্দ থতমত খেয়ে বললেন,’কাকে ফাঁসাতে চাও?’
হাবিব সামলে নিয়ে বললেন,’না……মানে,ভাবছিলাম আর কি……তা ঘটনা কি??
আকন্দ উতপূল্ল্য কন্ঠে বললেন,’বাপ হতে যাচ্ছি দোস্ত!সামনের কয়েকটা বছর বউ বাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত থাকবে,আমাকে জ্বালানোর ফুসরতই পাবে না!ও লালালালাআআআআআ…!আজ ফির জিনেকি তামান্না হায়…………!!!

হাবিব ভাবলেন,আকন্দকে বুঝিয়ে বলবেন,যে সামনের ক’টা দিন গর্ভবতী বৌ আকন্দের জীবনকে কড়া আঁচে ডুবো তেলে ভাজবে,বাচ্চা হবার পর তো কড়াই থেকে সোজা উনুনে……
কিন্তু সাঁতপাঁচ ভেবে সামনে নিয়ে তিনি ড্রয়ার থেকে দুদুটো বড় গেলাস বের করলেন।

চার,
দিন যাচ্ছিলো।আকন্দ আর হাবিবের আশংকাই সত্য হয়েছিলো,গর্ভবতী অব্বস্থায় তাদের স্ত্রীরা পুর্বাপর যেকোন অবস্থার চাইতে আরো হিংস্র আর পুর্বাভাষের অযোগ্য হয়ে গেলেন।

বছরখানেকের বিবাহিত জীবনে যেসব ইশারা-ইঙ্গিত অনুধাবন করে প্রয়মেটিভ স্টাইলের কলা কলাকৌষল আকন্দ আর হাবিব শিখেচিলেন,তার সবই জলে বিজর্সিত হলো।দিনরাত চব্বিশঘন্টা আক্কুনি আর হেবোনি নানা অনুযোগ,অভিযোগ,আর্তনাদ ও আবদারে তাদের দুজনকে ব্যতিব্যস্ত করে ছাড়লেন।আকন্দ যেচে পড়ে হাবিবের নামে গালমন্দ করে এবং হেবোনির রুচিবোধের নিন্দাবাদ করে আক্কুনিকে বশ করার চেস্টা করলেন,আক্কুনি তাতে একরাতের মত সন্তুষ্টিবাচক নীরবতা পালন করলে ও পরদিন আবার অগ্নিমূর্তি ধারণ করলেন।
হাবিব ও আকন্দের অজান্তে স্বাধীনভাবে বন্ধুগীবতের পথটি আবিষ্কার করে কিছুদুর তাতে হেঁটে একরাতের মত স্বস্তি পেলেন,কিন্তু হেবোনি পরেরদিনই ভোরে আবার লেলিহান শিখা বাগিয়ে তেড়ে এলেন।
আকন্দ অফিসে প্যাটারনিটি লিভ দাবি করে বিফল হয়ে পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করলেন,যে অন্তত পাঁচমাসের প্যাটারনিটি লিভ যে প্রতিটি পিতৃলদ্ধ পুরুষের অবশ্যপ্রাপ্য,তা নিয়ে রীতিমত অনলবর্ষী সব আর্টিকেল লিখে চললেন।
ওদিকে হাবীব স্থানীয় বদলোকদের হাতে পায়ে ধরে তাদের পাঁচটা মাসের জন্যে পেঁজোমি ক্ষ্যামা দিতে অনুরোধ জানিয়ে বিফল হয়ে আদালতে ঘুরঘুর করতে লাগলেন,মোকাদ্দমার তারিখগুলো একটু গ্যাপ দিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করতে।স্থানীয় স্কুলের মাস্টারেরা ও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

সন্তান প্রসবের মাসদুয়েক আগে আক্কুনি আর হেবোনি তাদের পিত্রালয়ে গমন করলেন।বৌদের বাপের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আকন্দ আর হাবিবের বিবাহের পর এই প্রথমবারের মত ভোর পর্যন্ত স্থানীয় গোপন মদের আড্ডায় একেবারে চুরচুর হয়ে মাল টেনে বাড়ি ফিরলেন।

তারপর একদিন আকন্দ শ্বশুরবাড়ি থেকে খবর পেলেন,তার একটি কন্যা সন্তান জন্মেছে।আনন্দে আত্নহারা হয়ে হাবিবকে ফোনে এই সংবাদ জানাতে গিয়ে তিনি শুনলেন হাবিব ও একটি পুত্র সন্তানের জনক হয়েছেন।

শ্বশুরবাড়িতে ছুটে গিয়ে সদ্যোজাত অন্যাকে পরম স্নেহে কোলে তুলে নিয়ে আকন্দ একটু থতমত খেলেন।দিব্যি ওঁয়া ওঁয়া করছে মেয়েটি,হাত-পা-চোখ-কান-নাক সবই ঠিকাছে,মায়ের মত ফর্সা হয়েছে সে,কিন্তু কী একটি হিসাব যেন মিলছে না!

বীব ও শ্বশুরবাড়ি থেকে ছেলেকে কোলে নিয়ে চমকে উঠলেন।সদ্যপ্রসুত ছোকরাটাই হাত-পা নাড়ছে,তার চোখ-কান-নাক সবই ঠিকাছে,কিন্তু কোথায় যেন হিসাবে গরমিল রয়ে গেছে!

পরদিন শ্বশুরবাড়ি থেকে গাড়ি চালিয়ে আসতে আসতে হটাত আকন্দের মাথাটা দপদপ করে উঠল।তিনি একসিলেরেটরে পা দাবিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে চললেন হাবীবের বড়ির দিকে।যখন পৌঁছলেন,তখন সন্ধ্যে হব হব করছে।হাবিবের বাড়িতে তখনও অন্ধকার।লোকজন সব হাবিবের শ্বশুর-বাড়িতে।
হাবিব বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে স্বাগত জানালেন বন্ধুকে।
‘দোস্ত আক্কু,কনগ্রাচুলেশন্স!’
উত্তরে আকন্দ একটা লোহার রড বাগিয়ে হাবিবের মাথার একেবারে মাঝখানে জোড়াভুরুর মধ্যিখানে বসিয়ে দিলেন।এই সে জোড়াভুরু,যা তার মেয়ের কপালে শোভা পাচ্ছে।

আকন্দ সে লোহার রড দিয়ে চ্যাঙাব্যাঙ্গা করে পেটলেন হাবিবকে।তার রাগ যখন পড়ে এল,তখন দেখলেন,হাবিব আর বেঁচে নেই।’
আকন্দ পাকা লোক,তিনি হাবিবের লাশখানা হাবিবেরই বাড়ির পাশের বাগানে পুঁতে ফেললেন।গাড়িতে একটা বেলচা ছিল,সেটা দিয়ে অতিদ্রুত বাগানের নরম মাটি খুড়ে তিনি হাবিবকে গায়েব করলেন।তারপর ফিরে চললেন নিজের বাড়ির দিকে,।

বাড়ির কাছাকাছি এসে তিনি দেখলেন বাড়িতে কোন আলো জ্বলছে না।জ্বলবে কীভাবে ,লোকজন তো সবই তার শ্বশুর-বাড়িতে।গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির ভেতরে ঢুকে তিনি থমকে গেলেন।দেখলেন তার বন্ধু হাবির,যাকে তিনি কিছুক্ষন আগে বেধড়কভাবে পেঁদিয়ে মেরে তারই বাগানে তালের আঁটির মত পুঁতে এসেছেন,সে পাগলের মত তার বাগানের মাটি খুড়ছে,পাশে পড়ে আছে একটা মৃতদেহ,সেটার নাকমুখ ঠিক কোনটাই আস্ত নাই।বাকী শরীরগুলোর মত সেটিও থ্যাতলানো,কিন্তু কপালের মস্ত আঁচিলটা অক্ষত রয়েছে।আকন্দ এক বিকট চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন।

উল্লেখ্য যে হাবীবের ছেলের কপালে একটা মস্ত বড় আছিল ছিল,ঠিক আর রায়হান আকন্দের মত!

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here